৭ বীরশ্রেষ্ঠের পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান

৭ বীরশ্রেষ্ঠের পরিচয় : বাংলা ভূমির হাজার বছরের ইতিহাসে ১৯৭১ এক অনন্য মাইলফলক। এর আগেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রে বাঙালি জাতি বিভেদ ভুলে এক হতে শুরু করেছিল। পরবর্তীতে নেতৃত্বের জাদুকরী শক্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে বাঙালি জাতি পেয়েছে স্বাধীনতার স্বাদ। একাত্তরে এক নেতা এক দেশ, শেখ মুজিবের বাংলাদেশ’ এই ছিল তার পরিচয়। সেদিন ‘জয় বাংলা’র মন্ত্রে এই ছিল উজ্জীবিত। ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আলোচিত আত্মত্যাগ করেন ৭ বীর সন্তান। বিজয়ের এই মাসে বীরশ্রেষ্ঠদের নিয়ে আমাদের এই বিশেষ আয়ােজন….

বীরশ্রেষ্ঠ মােহাম্মদ মােস্তফা কামাল

বীরত্বের ঘটনা

মােহাম্মদ মােস্তফা কামাল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৬৭ বাড়ি থেকে পালিয়ে ইস্ট গেল রেজিমেন্টে যােগ দেন। তিনি প্রশিক্ষণ শেষে কুমিল্লার ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে নিয়ােগ পান। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন পূর্বে তিনি অবৈতনিক ল্যান্স নায়েক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৭১ সালের উত্তাল জনৈতিক পরিবেশে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে অভ্যন্তরীণ গােলযােগ নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মােতায়েন করে।

পাকিস্তানি চক্রান্ত বুঝতে পেরে কয়েকজন বাঙালি সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে মেজর শাফায়াত জামিল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে. কর্নেল খিজির হায়াত খানসহ সকল পাকিস্তানি অফিসার ও সেনাদের গ্রেপ্তার করেন। এরপর তারা মেজর খালেদ মােশারফের নেতৃত্বে আশুগঞ্জ, উজানিস্বর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এন্ডারসন খালের পাশ দিয়ে শিক্ষা অবস্থান নেন। ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী হেলিকপ্টার গানশিপ, নেভাল গানবােট ও এফ-৮৬ বিমানযােগে মুক্তিবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপর ত্রিমুখী আক্রমণ চালায়।

গঙ্গাসাগর প্রতিরক্ষা অবস্থানের দরুইন গ্রামে নিয়ােজিত আলফা কোম্পানির ২নং প্লাটুনের একজন সেকশন কমান্ডার ছিলেন মােস্তফা কামাল। ১৭ এপ্রিল সকাল থেকে পাকবাহিনী তীব্র গােলাবর্ষণ শুরু করে প্লাটুন পজিশনের ওপর। আক্রমণের খবর পেয়ে মেজর শাফায়াত অবস্থানকে আরাে শক্তিশালী করতে হাবিলদার মুনিরের নেতৃত্বে ডি কোম্পানির ১১ নম্বর প্লাটুন পাঠান। সারাদিন যুদ্ধ চলে।

জন্ম  ১৬ ডিসেম্বর ১৯৪৭
মৃত্যু ১৮ এপ্রিল ১৯৭১
জন্মস্থান হাজীপুর , দৌলতখান, ভােলা।
যােদ্ধা ২নং সেক্টর
যুদ্ধ আখাউড়ার দরুইন গ্রামে।
পদবি সিপাহি
কর্মস্থল পাকিস্তান সেনাবাহিনী
সমাধি দরুইন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
বিশেষ তথ্য বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রথম শহিদ।

১৮ এপ্রিল সকালে শত্রুবাহিনী দরুইন গ্রামের কাছে পৌঁছে যায়। দুপুর ১২টায় অবস্থানের পশ্চিমদিক থেকে মূল আক্রমণ শুরু হয়। শত্রু বাহিনীর একটি দল প্রতিরক্ষার পিছন দিক দিয়ে মুক্তিবাহিনীকে ঘিরে ফেলে। মুক্তিবাহিনী দরুইন গ্রাম থেকে আখাউড়া রেল স্টেশনের দিকে পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু নিরাপদে সেখান থেকে সরে আসতে হলে তাদের প্রয়ােজন ছিল নিরবচ্ছিন্ন কাভারিং ফায়ার। মােস্তফা কামাল সহযােদ্ধাদের জানান যে, তিনি নিজে এই কাভারিং ফায়ার করবেন এবং সবাইকে পিছনে হটতে নির্দেশ দেন। সহযােদ্ধারা মােস্তফাকেও পশ্চাদপসরণের অনুরােধ করেন কিন্তু তিনি ছিলেন অবিচল।

মােস্তফার গুলিবর্ষণে পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রায় ২০-২৫ জন হতাহত হয় এবং তাদের অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়ে। পাকিস্তানিরা মরিয়া হয়ে তাঁর অবস্থানের ওপর মেশিনগান এবং মর্টারের গােলাবর্ষণ করতে থাকে। এক পর্যায়ে মোস্তফা কামালের এলএমজির গুলি নিঃশেষ হয়ে যায় এবং তিনি মারাত্মক জখম হন।

তখন পাকসৈন্যরা ট্রেঞ্চে এসে তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে তিনি প্রথম শহিদ হন। রুইন গ্রামের জনগণ মােস্তফা কামালকে তাঁর শাহাদত বরণের স্থানের পাশেই সমাহিত করেন। মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে।

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ

বীরত্বের ঘটনা

ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআর-এর ১৫০ জন সৈনিককে দায়িত্ব দেওয়া হয় রাঙামাটি-মহালছড়ি নৌপথে নিরাপত্তাব্যুহ তৈরির এই দলের এক নম্বর এলএমজি চালক মুন্সী আবদুর রউফ ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নানিয়ারচর উপজেলাধীন বাকছডির একটি বাঙ্কারে।

৮ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২ নং কমান্ডাে ব্যাটালিয়নের দুই কোম্পানি সৈনিক ৭টি স্পিডবােট ও ২টি লঞ্চ সহযােগে রাঙামাটি-মহালছড়ি নৌপথের আশেপাশে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা মুক্তিবাহিনীর অবস্থান আঁচ করে লঞ্চ থেকে তাদের অবস্থানের ওপর মর্টারে গােলাবর্ষণ শুরু। করে। এই অতর্কিত আক্রমণে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এই সুযােগে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য তীরে নেমে মুক্তিবাহিনীর অবস্থান ঘিরে ফেলে।

জন্ম ৮ মে ১৯৪৩
মৃত্যু ২০ এপ্রিল ১৯৭১
জন্মস্থান সালামতপুর, বােয়ালমারী , ফরিদপুর।
যােদ্ধা ১নং সেক্টর
যুদ্ধ রাঙামাটি-মহালছড়ি নৌপথে
পদবি ল্যান্সনায়েক
কর্মস্থল ইপিআর
সমাধি রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর

ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান পিছনে হটার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু নিরাপদে অবস্থান ত্যাগের জন্য প্রয়ােজন নিরবচ্ছিন্ন কাভারিং ফায়ার। আবদুর রউফের এলএমজির কাভারিং ফায়ারে দায়িত্ব দিয়ে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান তাঁর সৈন্যদের নিয়ে পিছনে হটতে থাকেন। তাঁর অব্যর্থ গুলিতে স্পিডবােটগুলাে ডুবে যায় এবং সেগুলােতে অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যরা হতাহত হয়। বাকি সৈন্যরা লঞ্চ দুটিতে করে পালাতে থাকে।

পাক সৈন্যরা এলএমজির রেঞ্জের বাইরে গিয়ে লঞ্চ থেকে মর্টারে গােলাবর্ষণ করতে থাকে। অসমসাহসী আবদুর রউফ তখনাে গুলি চালানাে অব্যাহত রেখেছিলেন। অকস্মাৎ শত্রুর একটি গােলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাঁর দেহ। সহযােদ্ধারা পরে তাঁর লাশ উদ্ধার করে নানিয়ারচরের চিংড়ি খাল সংলগ্ন একটি টিলার ওপর সমাহিত করেন।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্ব ও আত্মদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে। বাংলাদেশ রাইফেলস ১৯৭৩ সালে মুন্সী আবদুর রউফকে অনারারি ল্যান্স নায়েক পদে মরণােত্তর পদোন্নতি দান করে।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান

বীরত্বের ঘটনা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ছুটিতে এসে মতিউর রহমান স্থানীয়ভাবে মুক্তিযােদ্ধাদের সংগঠিত করেন। ভৈরবে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। পরে পারিবারিক চাপে মে মাসে তিনি পাকিস্তান চলে যান।

সেখানে তিনি বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল বিমান ছিনতাই করে সেটি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যােগ দেবেন। ২০ আগস্ট সকালে করাচির মাশরুর বিমানঘাঁটি থেকে পাইলট অফিসার মিনহাজ রশিদের টি-৩৩ বিমান নিয়ে উড়বার সিডিউল ছিল।

জন্ম ২৯ অক্টোবর ১৯৪১
মৃত্যু ২০ আগস্ট ১৯৭১
জন্মস্থান পৈতৃক নিবাস রায়পুরা, নরসিংদী।
পদবি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট
কর্মস্থল পাকিস্তান বিমানবাহিনী।
সমাধি পাকিস্তানের করাচির মৌরিপুর মাশরুর ঘাঁটি। পরবর্তীতে ২৫ মার্চ ২০০৬ তাঁর দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনা হয় এবং মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পূর্ণ মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

মতিউর ছিলেন তার প্রশিক্ষক। এ বিমানের সাংকেতিক নাম ছিল ‘ব্লু বার্ড’। প্রশিক্ষণকালে মতিউর বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। বিমানটি বিধ্বস্ত হয় ভারতীয় সীমান্তের কাছে থাট্টায়। মতিউরের মৃতদেহ ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পাওয়া গেলেও মিনহাজের লাশ পাওয়া যায়নি।

বিশেষ তথ্য :

  • মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি টি-৩৩ বিমান (ছদ্মনাম ‘ব্লু-বার্ড) ছিনতাই করে দেশে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় শহিদ হন।
  • তাঁর জীবনের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্রের নাম ‘অস্তিত্বে আমার দেশ।
যুদ্ধ :

পাকিস্তানের মাশরুর বিমানঘাঁটিতে টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান ছিনিয়ে নিয়ে ভারতীয় সীমান্তের উদ্দেশে যাত্রা। এ টিভির পর্দায় মতিউর রহমান। মতিউর রহমানকে নিয়ে ২০০২ সালে ‘অগ্নিবলাকা’ নামে একটি ডকুড্রামা নির্মাণ করা হয়, যেখানে রিয়াজ মতিউর রহমানের চরিত্রে এবং তারিন তার স্ত্রী মিলির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এছাড়া তার জীবনী নিয়ে ২০০৭ সালে ‘অস্তিত্বে আমার দেশ চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়।

সম্মাননা

মতিউর রহমানের দেশপ্রেম ও আত্মদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৩ তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যশাের বিমানঘাটি তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে।

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মােহাম্মদ শেখ

বীরত্বের ঘটনা

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে গ্রামের বাড়িতে ছুটি কাটাতে এসে নূর মােহাম্মদ শেখ মুক্তিবাহিনীতে যােগ দেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি যশোর ৮নং সেক্টরে যুদ্ধরত ছিলেন। ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ যুতিপুরে নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যুহের সামনে যশাের জেলার গোয়ালহাটি গ্রামে তাঁকে অধিনায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি ট্যান্ডিং পেট্রোল পাঠানাে হয়।

জন্ম ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬
মৃত্যু ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
জন্মস্থান মহিষখােলা, নড়াইল
যােদ্ধা ৮নং সেক্টর
যুদ্ধ যশােরের শার্শার বয়রায়
পদবি ল্যান্সনায়েক
কর্মস্থল ইপিআর
সমাধি যশােরের কাশিপুর গ্রামে।

সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ঠাৎ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পেট্রোলটি তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে গুলিবর্ষণ শুরু করে। মুক্তিযােদ্ধারা পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। সিপাহি নানু মিয়া গুলিবিদ্ধ হলে নূর মােহাম্মদ তাঁকে কাঁধে তুলে নেন এবং হাতের এলএমজি দিয়ে এলােপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করলে শত্রুপক্ষ পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। হঠাৎ করেই শত্রুর মর্টারের একটি গােলা এসে তার ডান কাঁধে লাগে।

তিনি শত্রুদের ঠেকিয়ে রাখার দায়িত্ব নেন এবং অন্য সঙ্গীদের চলে যেতে অনুরােধ করেন। তিনি সমানে গুলি ছুড়তে লাগলেন। শত্রুপক্ষ এই বীর যােদ্ধাকে বেয়নেট চার্জ করে চোখ দুটো উপড়ে ফেলে এবং মস্তক বিদীর্ণ করে ঘিলু ছড়িয়ে ফেলে। পরবর্তীতে পাশের একটি ঝাড় থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করে। যশোরের কাশিপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়।

সম্মাননা

নূর মােহাম্মদের দেশপ্রেম ও আত্মদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৩ তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান

বীরত্বের ঘটনা

হামিদুর রহমান মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে ধলই নামক স্থানে মুক্তিবাহিনীতে যােগ দেন। পাকসেনাদের ধলই সীমান্ত ঘাঁটির সামরিক গুরুত্বের কারনে মুক্তিযােদ্ধারা ঘাঁটিটি দখলের পরিকল্পনা করে। প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানিকে এ দায়িত্ব দেওয়া।

জন্ম ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩
মৃত্যু ২৮ অক্টোবর ১৯৭১
জন্মস্থান মহেশপুর, ঝিনাইদহ
যােদ্ধা ৪নং সেক্টর
পদবি সিপাহি
কর্মস্থল পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
সমাধি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামে। পরবর্তীতে ১১ ডিসেম্বর ২০০৭ তাঁর দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনা হয় এবং মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পূর্ণ মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
বিশেষ তথ্য বীরশ্রেষ্ঠ খেতাপ্রাপ্তদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ

হামিদুর ছিলেন এই কোম্পানির সদস্য। ২৮ অক্টোবরের পূর্ণতে মুক্তিযােদ্ধাদের তিনটি প্লাটুন পাকসেনাদের ঘাঁটি অভিমুখে অগ্রসর হয়। ঘাঁটির কাছাকাছি এলে অকস্মাৎ একটি মাইন বিস্ফোরণের শব্দে শত্রুপক্ষ সচকিত হয়ে এলােপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। এ সংকটময় পরিস্থিতিতে হামিদুর শত্রুর এএমজি পােস্ট ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর দলকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গ্রেনেড হাতে রাতের অন্ধকারে হামাগুড়ি দিয়ে শত্রুর এলএমজি পােস্টের দিকে অগ্রসর হন এবং রাতের শেষ প্রহরে গ্রেনেড ছুড়ে দুই এলএমজি চালককে হত্যা করেন। কিন্তু নিজে তিনি শত্রুপক্ষের গুলিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মুক্তিযােদ্ধারা তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে ত্রিপুরা রাজ্যের আমবাসায় সমাহিত করেন।

সমাধি স্থানান্তর

হামিদুর রহমানের মৃতদেহ সীমান্তের অল্পদূরে ভারতীয় ভূখণ্ডে ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গােরস্থানে দাফন করা হয়। নিচু স্থানে অবস্থিত কবরটি একসময় পানিতে তলিয়ে যায়। ২৭ অক্টোবর ২০০৭ বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার হামিদুর রহমানের দেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১০ ডিসেম্বর ২০০৭ বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সিমান্তে হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ গ্রহণ করে এবং যথাযােগ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সাথে কুমিল্লার বিবিরহাট সীমান্ত দিয়ে তাঁর দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে কার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ মাে. রুহুল আমিন

বীরত্বের ঘটনা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রুহুল আমিন এপ্রিল মাসে ত্রিপুরা সীমান্ত। অতিক্রম করে ২নং সেক্টরে যােগদান করেন। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি | বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে সকল সেক্টর থেকে প্রাক্তন নৌ-সেনাদের আগরতলায় সংগঠিত করে নৌবাহিনীর প্রাথমিক কাঠামাে গঠন করা হয়। পরে তাদের কলকাতায় আনা হয়।

সেখানে সবার সাথে রুহুল আমিনও ছিলেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে দুটি টাগবােট উপহার দেয়। এগুলােকে কলকাতার গার্ডেন রিচ নৌ-ওয়ার্কশপে দুটি বাফার গান ও মাইন-পড জুড়ে গানবােটে রূপান্তর করা হয়। গানবােট দুটির নামকরণ করা হয় ‘পদ্ম’ ও ‘পলাশ’ ।

জন্ম ১ জুলাই ১৯৩৫
মৃত্যু ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১
জন্মস্থান বাঘপাঁচড়া, নােয়াখালী
যােদ্ধা ১০নং সেক্টর
যুদ্ধ রূপসা নদী (গানবােট পলাশ)
পদবি ইঞ্জিনরুম আর্টিফিশার
কর্মস্থল নৌবাহিনী
সমাধি মােংলার রূপসা নদীর পাড়ে

রুহুল আমিন নিয়ােগ পান লাশের ইঞ্জিনরুম আর্টিফিশার হিসেবে। ৬ ডিসেম্বর মােংলা বন্দরে পাকিস্তানি নৌঘাটি পিএনএস তিতুমীর দখলের উদ্দেশ্যে ‘পদ্মা’, ‘পলাশ ও মিত্রবাহিনীর গানবােট পানভেল’ ভারতের হলদিয়া নৌঘাঁটি থেকে রওনা হয়।

৮ ডিসেম্বর সুন্দরবনের আড়াই বানকিতে বিএসএফের পেট্রোল ক্রাফট ‘চিত্রাঙ্গদা’ তাদের বহরে যােগ দেয়। ৯ ডিসেম্বর কোনাে বাধা ছাড়াই তারা হিরণ পয়েন্টে প্রবেশ করেন। পরদিন ১০ ডিসেম্বর ভাের ৪টায় তারা মােংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সকাল ৭টায় কোনাে বাধা ছাড়াই তারা মােংলায় পৌঁছান। পেট্রোল ক্রাফট চিত্রাঙ্গদা মােংলাতেই অবস্থান নেয় এবং পানভেল, পদ্মা ও পলাশ সামনে অগ্রসর হতে থাকে। দুপুর ১২টায় তারা খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছাকাছি পৌঁছান।

এ সময় আকাশে তিনটি জঙ্গিবিমান দেখা যায়। পদ্ম ও পলাশ থেকে বিমানের ওপর গুলিবর্ষণ করার অনুমতি চাইলে বহরের কমান্ডার বিমানগুলাে ভারতীয় বলে জানান। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে বিমানগুলাে পদ্মা ও পলাশের ওপর গুলি ও বােমাবর্ষণ শুরু করে। পলাশের কমান্ডার সবাইকে গানবােট ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু রুহুল আমিন পলাশেই অবস্থান নেন এবং আপ্রাণ চেষ্টা চালান গানবােটকে সচল রাখতে।

হঠাৎ শক্রর একটি গােলা পলাশের ইঞ্জিনরুমে আঘাত করে এবং তা ধ্বংস হয়ে যায়। শেষ মুহূর্তে রুহুল আমিন নদীতে লাফিয়ে পড়েন এবং আহত অবস্থায় কোনােক্রমে তীরে উঠতে সক্ষম হন। দুর্ভাগ্যক্রমে তীরে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরবর্তীতে তার লাশ ১৭ ডিসেম্বর রূপসার পাড়ে সমাহিত করা হয়।

সম্মাননা

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

বিশেষ তথ্য

বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে একমাত্র নৌবাহিনীর সদস্য বীরশ্রেষ্ঠ মাে. রুহুল আমিন।

বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর

বীরত্বের ঘটনা

মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ছিলেন ৭নং সেক্টরের মেহেদিপুরের (মালদহ জেলায়) সাব-সেক্টরের কমান্ডার। এ সময় লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান ৭নং সেক্টরের সেক্টর-কমান্ডার ছিলেন। মহিউদ্দিন পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কানসার্ট, আরগরার হাট ও শাহপুরসহ কয়েকটি সফল অভিযানে অসাধারণ নৈপুণ্য ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। ফলে ডিসেম্বর মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখলের জন্য তাঁকে একটি মুক্তিযােদ্ধা দলের নেতৃত্ব দেওয়া। হয়।

জন্ম ৭ মার্চ ১৯৪৯
মৃত্যু ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১
জন্মস্থান রহিমগঞ্জ, বরিশাল
যােদ্ধা ৭নং সেক্টর
যুদ্ধ চাঁপাইনবাবগঞ্জ
পদবি ক্যাপ্টেন
কর্মস্থল সেনাবাহিনী
সমাধি চাঁপাইনবাবগঞ্জ
বিশেষ তথ্য বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে সর্বশেষ শহিদ।

১৩ ডিসেম্বর প্রত্যুষে তিনি এক প্লাটুন মুক্তিযােদ্ধাসহ রেহাইচরের মধ্য দিয়ে নৌকাযােগে মহানন্দা নদী পার হন এবং অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে শত্রুর বেশ কয়েকটি বাঙ্কার দখল করে নেন। পাকিস্তানি বাহিনী তখন পশ্চাদপসরণ করে নওয়াবগঞ্জ শহরে অবস্থান নেয় এবং একটি দালানের ছাদ থেকে মেশিনগানে অনবরত গুলি চালিয়ে মুক্তিযােদ্ধাদের শহরাভিমুখে অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে রাখে।

এই সংকটময় সময়ে মহিউদ্দিন শত্রুর মেশিনগান ধ্বংস করার পরিকল্পনা নেন। তিনি বা হাতে এসএমজি ও ডান হাতে একটি গ্রেনেড নিয়ে গােপনে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসেন। হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তা পার হয়ে তিনি দ্রুত মেশিনগানবাহী বাড়িটির দিকে ধাবিত হন। ত্বরিতগতিতে তিনি মেশিনগান বরাবর গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। বিস্ফোরিত গ্রেনেডের আঘাতে মেশিনগানের স্থলটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়।

অকস্মাৎ রাস্তার পাশের একটি দোতলা বাড়ি থেকে শক্রর একটি গুলি তাঁর কপালে বিদ্ধ হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এতে হতােদ্যম না হয়ে মুক্তিযােদ্ধারা সন্ধ্যার দিকে শত্রুর অবস্থানের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। গভীর রাত পর্যন্ত এ আক্রমণ অব্যাহত ছিল। পাকসেনারা শেষ পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে নওয়াবগঞ্জ শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ভাের রাতে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের মৃতদেহ উদ্ধার করে তাঁকে ছােটো সােনা মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। 

সম্মাননা

মুক্তিযুদ্ধে বীরােচিত ভূমিকা ও আত্মদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানসূচক বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

Related posts

Some important recent facts about The sky-space

Various medals and awards of Bangladesh 2022

As many films about Bangabandhu

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Read More